বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকা নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, চোখের সামনে সাধারণত কয়েকজন পুরুষ উদ্যোক্তার চেহারা ভেসে ওঠে। ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস কিংবা বার্নার্ড আরনল্ডদের মতো নামগুলোই সংবাদপত্রের শিরোনামে থাকে নিয়মিত। কিন্তু এই কোটিপতিদের দুনিয়ায় নারীদের অবস্থান ঠিক কোথায়? বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ নিয়ন্ত্রকদের আসনে বসার দৌড়েই বা কতটা এগিয়েছেন তারা?
ফোর্বস এবং ওয়েলথ-এক্স এর মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধনকুবেরদের বৈশ্বিক মানচিত্রে নারীদের উপস্থিতি আগের চেয়ে বাড়লেও, বৈষম্যের বিশাল এক দেওয়াল এখনো রয়ে গেছে।
শতকরা ১৩ ভাগের সীমাবদ্ধতা
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট বিলিয়নেয়ারদের মধ্যে নারীদের হার মাত্র ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রতি ১০০ জন শতকোটিপতির মধ্যে মাত্র ১৩ জন নারী, বাকি ৮৭ জনই পুরুষ। সংখ্যার বিচারে বিশ্বজুড়ে নারী বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা এখন সাড়ে তিনশর কিছু বেশি। আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যাটিকে বড় মনে হলেও, বৈশ্বিক মোট সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রে এটি এখনো অত্যন্ত নগণ্য।
১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের সামাজ্য
সংখ্যায় কম হলেও এই সাড়ে তিনশ নারীর হাতে থাকা সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ কিন্তু বিশাল। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ধনী নারীদের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৮০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার।
লরিয়ালের উত্তরাধিকারী ফ্রাঁসোয়া বেটেনকোর্ট মেয়ার্স কিংবা ওয়ালমার্ট সাম্রাজ্যের অ্যালিস ওয়ালটনের মতো নারীরা এককভাবেই হাজার কোটি ডলারের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা অনেক দেশের বার্ষিক জিডিপির চেয়েও বেশি।
উত্তরাধিকার বনাম ‘সেলফ-মেড’ বা আত্মপ্রতিষ্ঠিত
নারী ধনকুবেরদের এই তালিকায় একটি বড় ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো ‘উত্তরাধিকার’। বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনী নারীর অধিকাংশেরই সম্পদের মূল উৎস পারিবারিক ব্যবসা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি। তবে আশার কথা হলো, গত এক দশকে এই চেনা ছকে বড় পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে প্রযুক্তি, ফাইন্যান্স, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্টার্ট-আপের হাত ধরে এমন একঝাঁক নারী উঠে আসছেন, যারা কোনো পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও ঝুঁকিতে বিলিয়নেয়ার ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন। এই ‘সেলফ-মেড’ বা আত্মপ্রতিষ্ঠিত নারীদের উত্থান বৈশ্বিক করপোরেট সংস্কৃতির রূপান্তরকে নির্দেশ করে।
ভবিষ্যতের পথ ও সমতার চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং করপোরেট নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কারণে আগামী দিনগুলোতে নারী ধনকুবেরদের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে। তবে এই ১৩ শতাংশের দেওয়াল ভেঙে সমতায় পৌঁছাতে হলে পুঁজিতে নারীদের সমান প্রবেশাধিকার এবং নীতিগত সহায়তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে।
ধনকুবেরদের দুনিয়ায় নারীদের এই ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের রাজত্ব কেবল ব্যক্তিগত সফলতার গল্প নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে নারীর ক্রমবিকাশমান ক্ষমতার এক নীরব প্রতীকও বটে।