Home Second Lead দক্ষিণ আফ্রিকায় কেন থামছে না বাংলাদেশিদের লাশের মিছিল?

দক্ষিণ আফ্রিকায় কেন থামছে না বাংলাদেশিদের লাশের মিছিল?

স্বপ্ন যখন কফিনবন্দি

শাহিন কবির, প্রিটোরিয়া: ভাগ্য বদলের অদম্য ইচ্ছা আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন হাজারো বাংলাদেশি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন প্রতিনিয়ত কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছে। গত কয়েক দশকে দেশটিতে শত শত বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যা বর্তমানে এক চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই লাশের মিছিল যেন থামবার লক্ষণ নেই।

ব্যবসায়িক ঈর্ষা: যখন সাফল্যই কাল হয়- দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রামীণ জনপদ বা ‘টাউনশিপ’গুলোতে বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক উত্থান অত্যন্ত ঈর্ষা জাগানিয়া। কঠোর পরিশ্রম এবং কম লাভে পণ্য বিক্রির কৌশলে বাংলাদেশিরা স্থানীয় বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ব্যবসায়িক সাফল্যই অনেক সময় তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক সময় পেশাদার ‘হিটম্যান’ বা ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করে বাংলাদেশিদের সরিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে।

বর্ণবিদ্বেষ ও ‘জেনোফোবিয়া’র ছোবল: দক্ষিণ আফ্রিকায় মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ‘জেনোফোবিয়া’ বা অভিবাসীবিরোধী দাঙ্গা। স্থানীয়দের একটি বড় অংশের ধারণা, বিদেশিরা তাদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে। এই বিদ্বেষের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয় বাংলাদেশিদের পরিচালিত ‘স্প্যাজা শপ’ বা মুদি দোকানগুলো। দাঙ্গার সময় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের।

সহজ লক্ষ্যবস্তু ও চাঁদাবাজি: বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সাধারণত ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেয়ে নগদ লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দোকানের ক্যাশ বাক্সে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা রাখার এই প্রবণতা স্থানীয় ডাকাত দলগুলোকে আকৃষ্ট করে। অপরাধী চক্র নিয়মিত চাঁদা দাবি করে এবং চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই সরাসরি মাথায় গুলি করে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল: বিষফোঁড়া যখন নিজ সম্প্রদায়

 উদ্বেগের আরও একটি কারণ হলো বাংলাদেশিদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, পাওনা টাকা, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এক বাংলাদেশি অন্য বাংলাদেশিকে হত্যার জন্য স্থানীয় খুনিদের অর্থ দিচ্ছে—এমন অভিযোগ এখন নিয়মিত। বিদেশের মাটিতে নিজ দেশের মানুষের হাতেই প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভীতিপ্রদ।

প্রশাসনিক উদাসীনতা ও আইনি জটিলতা

নিহতদের পরিবারের দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ ও প্রশাসন এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারে চরম উদাসীন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা হলেও আসামীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এছাড়া অনেক প্রবাসী সেখানে অবৈধভাবে অবস্থান করায় পুলিশের সাহায্য নিতে ভয় পান, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

প্রিটোরিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন বিভিন্ন সময় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।

আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতি বছর গড়ে ২০০-এর বেশি বাংলাদেশি প্রাণ হারাচ্ছেন। গত কয়েক বছরে এই সংখ্যা আরও বেশি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

বিশ্লেষকদের মত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট উত্তরণে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাড়ানো, স্থানীয় আইন মেনে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যবসা করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com