Home অন্যান্য সরাসরি সাক্ষাৎকার ও নিউজ এভয়ডেন্স: প্রথাগত সাংবাদিকতার নতুন চ্যালেঞ্জ

সরাসরি সাক্ষাৎকার ও নিউজ এভয়ডেন্স: প্রথাগত সাংবাদিকতার নতুন চ্যালেঞ্জ

ফরিদুল  আলম, ঢাকা: বর্তমান বিশ্ব গণমাধ্যমে ‘নিউজ বাইপাস’ (News Bypass) এবং ‘নিউজ এভয়ডেন্স’ (News Avoidance) বা খবর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এক আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের উদাসীনতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মূলধারার সাংবাদিকদের মুখোমুখি না হওয়ার সংস্কৃতি সাংবাদিকতার জবাবদিহিতাকে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
নেতিবাচক খবরের ক্লান্তি এবং নিউজ এভয়ডেন্স
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এবং প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দার মতো নেতিবাচক খবরের ভিড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী একটি বড় অংশের পাঠক ও দর্শক সচেতনভাবে খবর পড়া বা দেখা বন্ধ করে দিচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, মূলধারার সংবাদ তাদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে কিন্তু জীবনের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে না।
এই সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম। ব্যবহারকারী একবার খবর এড়িয়ে যাওয়া শুরু করলে, প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের টাইমলাইনে বিনোদনমূলক ও হালকা ধাঁচের কনটেন্ট বেশি বেশি পুশ করতে থাকে। ফলে পাঠক পুরোপুরি তথ্য-বিচ্ছিন্ন বা একটি নির্দিষ্ট ‘ফিল্টার বাবল’-এর মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ছেন।
পডকাস্ট ও ইউটিউবারদের উত্থান: কেন মূলধারা এড়াচ্ছেন প্রভাবশালীরা?
নিউজ বাইপাসের সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা যাচ্ছে রাজনীতি ও কর্পোরেট বিশ্বে। বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপ্রধান এবং শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এখন আর প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের কঠিন ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চাইছেন না। এর পরিবর্তে তারা বেছে নিচ্ছেন জনপ্রিয় পডকাস্টার, ইনফ্লুয়েন্সার বা ইউটিউবারদের।
এর পেছনে মূল কারণ কয়েকটি:
  • ১. নিয়ন্ত্রিত ন্যারেটিভ: মূলধারার সাংবাদিকতায় যেকোনো বক্তব্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও ক্রস-কোশ্চেনিং বা পাল্টা প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু পডকাস্টগুলোতে সাধারণত খোলামেলা আড্ডা বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পরিবেশ থাকে, যেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের এজেন্ডা বা ন্যারেটিভ কোনো বাধা ছাড়াই সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
  • ২. তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো: প্রথাগত টেলিভিশন বা সংবাদপত্র থেকে তরুণ প্রজন্ম অনেক দূরে সরে গেছে। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা জানেন, নতুন প্রজন্মের ভোটার বা গ্রাহকদের ধরতে হলে ইউটিউব বা পডকাস্টের চেয়ে বড় মাধ্যম আর নেই।
  • ৩. ফিল্টারিং এড়ানো: সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় নীতি বা গেটকিপিংয়ের মাধ্যমে খবরের সত্যতা ও জনগুরুত্ব যাচাই করা হয়। প্রভাবশালীরা এই সম্পাদকীয় ফিল্টারিং এড়াতে সরাসরি নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেল বা পছন্দের ক্রিয়েটরের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।
জবাবদিহিতার সংকট ও গণতন্ত্রের ওপর প্রভাব
এই প্রবণতা প্রথাগত সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি তথা ‘ফোর্থ এস্টেট’ বা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের ভূমিকাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান কাজ হলো ক্ষমতাশীলদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং জনসাধারণের পক্ষে কঠিন প্রশ্ন করা। যখন দেশের নীতিনির্ধারকেরা পেশাদার সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন এবং কেবল অনুগত বা বিনোদনমূলক মাধ্যমের সাথে কথা বলেন, তখন তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা নষ্ট হয়।
পডকাস্টার বা ইনফ্লুয়েন্সাররা চমৎকার উপস্থাপক হতে পারলেও, তাদের অধিকাংশেরই পেশাদার সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ বা সম্পাদকীয় দায়বদ্ধতা থাকে না। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি বা নীতিনির্ধারণী ভুলের বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা এখন প্রথাগত সংবাদ উপস্থাপনের ধরনে পরিবর্তন আনার তাগিদ দিচ্ছেন। কেবল নেতিবাচক সংবাদ নয়, বরং সংকটের সমাধানের পথ দেখানো (Solutions Journalism) এবং পাঠকের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমেই কেবল এই ‘নিউজ বাইপাস’ সংস্কৃতি রুখে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
Visit www.businesstoday24.com