বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজের (পুরোনো জাহাজ) মূল্যে বড় ধরনের মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে। মে ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক পতনের প্রভাব জুন মাসে এসে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে টন প্রতি জাহাজের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাওয়ায় নতুন করে বিনিয়োগ বা স্ক্র্যাপ জাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে চরম সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বাংলাদেশের ইয়ার্ড মালিকরা।
আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান চিত্র
আন্তর্জাতিক শিপিং ও ডেমোলিশন মার্কেটের সাম্প্রতিক তথ্য (জুন ২০২৬) অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ফ্রেইট রেট (জাহাজ ভাড়া) তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক মালিক পুরোনো জাহাজ স্ক্র্যাপ না করে তা আরও কিছুদিন পরিচালনায় রাখছেন। এর ফলে বাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজের সরবরাহ যেমন সীমিত, তেমনি প্রধান প্রধান রিসাইক্লিং হাবগুলোতে দামেও একটি বড় ধরনের স্থবিরতা ও মন্দা ভাব তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ক্যাটাগরির জাহাজের লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টন (LDT) প্রতি মূল্য নিম্নরূপ:
বাংলাদেশ: কন্টেইনার জাহাজ প্রতি এলডিটি ৪৯০ থেকে ৫০০ ডলার, ট্যাংকার (Wet) ৪৮০ থেকে ৪৯০ ডলার এবং ড্রাই বাল্ক ৪৬০ থেকে ৪৭০ ডলার।
পাকিস্তান: কন্টেইনার ৪৭৫ থেকে ৪৮৫ ডলার, ট্যাংকার ৪৬৫ থেকে ৪৭৫ ডলার।
ভারত: কন্টেইনার ৪৫০ থেকে ৪৬০ ডলার, ট্যাংকার ৪৪০ to ৪৫০ ডলার।
এই মূল্য গত বছরের তুলনায় বেশ কম। মে মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে দামের এই নিম্নমুখী ও অস্থিতিশীল প্রবণতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার ইয়ার্ডগুলো, বিশেষ করে ভারতের আলিয়াং এবং পাকিস্তানের গাদানি ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ ভেড়ার হার রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। ভারতের আলিয়াং ইয়ার্ডে মে মাসে মাত্র ১টি জাহাজ বিচিং বা ভাঙার জন্য আনা হয়েছিল, যা ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশের বাজারে প্রভাব
আন্তর্জাতিক বাজারে দামের এই মন্দাভাব এবং স্থানীয় বাজারে রড ও ইস্পাতের চাহিদার ওঠানামা বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্পে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এখনও সর্বোচ্চ দর (টন প্রতি সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার পর্যন্ত) ধরে রেখেছে, তবুও স্থানীয় ইয়ার্ড মালিকরা নতুন এলসি (Letter of Credit) খোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ধীর নীতি অবলম্বন করছেন।
এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ কাজ করছে:
১. ডলার সংকট ও ব্যাংকিং কড়াকড়ি: ডলারের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এখনও বড় অঙ্কের এলসি খোলা বেশ জটিল। এর ওপর ঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে মাঝারি ও ছোট ইয়ার্ডগুলো নতুন করে বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না।
২. বাজেট ও অবকাঠামোগত প্রত্যাশা: জুন ২০২৬-এর জাতীয় বাজেটে বড় কোনো অবকাঠামোগত প্রকল্পের ঘোষণা আসবে কি না, সেদিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয় ইস্পাত মিল ও ইয়ার্ড মালিকরা। যদি বড় সরকারি প্রকল্প গতি পায়, তবেই স্থানীয় বাজারে স্ক্র্যাপ লোহার চাহিদা বাড়বে এবং ইয়ার্ডগুলো আবার সচল হবে।
৩. গ্রিন রিসাইক্লিংয়ের চাপ: হংকং কনভেনশন (HKC) অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব ইয়ার্ডে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়ায় ইয়ার্ড মালিকদের এখন বাড়তি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এই মন্দার সময়ে যা অনেক মালিকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের এই শিল্প খাতটি দেশের নির্মাণ শিল্পের প্রায় অর্ধেক কাঁচামাল বা স্ক্র্যাপ লোহা সরবরাহ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের এই মন্দাভাব যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক আবাসন ও নির্মাণ খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। ##