বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, রাজশাহী: দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব এখন কৃষিখাতে দৃশ্যমান। বিশেষ করে বাংলাদেশের আমের রাজধানী খ্যাত রাজশাহী ও তৎসংলগ্ন জেলাগুলোতে চলতি মৌসুমে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং অনাবৃষ্টির কারণে আম চাষিরা চরম সংকটের মুখে পড়েছেন।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় এবং প্রচণ্ড গরমে গাছের গুটি ঝরে পড়া রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ ও আমের গুটি ঝরছে আশঙ্কাজনক হারে
মার্চ ও এপ্রিল মাস জুড়ে চলা দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহে আমের গুটি বড় হওয়ার আগেই তা শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা যখন ৩৫°C থেকে ৪০°C অতিক্রম করে, তখন গাছের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত গরমে বোঁটা শুকিয়ে গিয়ে আমের গুটি ঝরে পড়ে, যাকে বলা হয় ‘হিট শক’।
রাজশাহীর বাঘা, পুঠিয়া ও চারঘাট এলাকার বাগান মালিকদের মতে, এবার আমের মুকুল ভালো এলেও তীব্র রোদে অর্ধেকের বেশি গুটি এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও সেচ সংকট
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচুতে। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে অগভীর নলকূপগুলোতে পানি উঠছে না। কৃষি বিভাগ থেকে আমের বোঁটা শক্ত রাখতে এবং গুটি ঝরা রোধে পর্যাপ্ত সেচের পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আমগাছের গোড়ায় আর্দ্রতা ধরে রাখতে নিয়মিত পানি দেওয়া প্রয়োজন হলেও পানির দুষ্প্রাপ্যতা চাষিদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট: মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা
সেচ কাজের জন্য কৃষকদের প্রধানত ডিজেল চালিত ইঞ্জিন বা বৈদ্যুতিক পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অনেক ক্ষুদ্র কৃষক বাড়তি খরচ বহন করতে না পেরে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বসে আছেন। সেচের পানির অভাবে শুধু গুটি ঝরা নয়, আমের আকার ছোট হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও বর্তমান পরিস্থিতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাগান মালিকদের বিকেলে বা খুব ভোরে গাছের গোড়ায় পানি দেওয়ার এবং প্রয়োজনে ম্যাঙ্গো হপার বা পোকামাকড় দমনে হালকা কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিছু এলাকায় গাছের গোড়ায় মালচিং (খড় বা কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দেওয়া) করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে মাটির রস সংরক্ষিত থাকে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কাছে এই প্রযুক্তিগত সহায়তাগুলো অনেক সময় ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
জলবায়ুর এই চরম ভাবাপন্ন অবস্থা আম চাষিদের যে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে সরকারি প্রণোদনা এবং সেচ কাজে বিশেষ বিদ্যুৎ সুবিধার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।