শামসুল ইসলাম, ঢাকা: খাবারে বিষের ভয়ে যখন সাধারণ মানুষ একটু সুস্থতার আশায় অর্গানিক বা বিষমুক্ত সবজি খুঁজছেন, ঠিক সেই সুযোগটিকেই হাতিয়ার করে নিয়েছে একদল অসাধু ব্যবসায়ী। অর্গানিক বা বিষমুক্ত—শব্দ দুটি এখন যেন কেবল চড়া দাম আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কোনো ধরনের বৈধ সার্টিফিকেট বা প্রমাণ ছাড়াই সাধারণ সবজিকে ‘অর্গানিক’ লেবেল লাগিয়ে দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে বাজারে।
আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজধানীর বিভিন্ন শপিং মল এবং নামী-দামী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হওয়া তথাকথিত এসব অর্গানিক সবজির বড় অংশই আসছে সাধারণ পাইকারি বাজার থেকে।
ভোররাতে কারওয়ান বাজার বা যাত্রাবাড়ী থেকে সাধারণ চাষিদের উৎপাদিত সবজি কিনে সেগুলোতে আকর্ষণীয় প্যাকেজিং আর ‘অর্গানিক’ স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এই সবজিগুলো আর সাধারণ পাঁচটা সবজির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কৃষকের ক্ষেতে যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে, তার সবটুকু উপাদানের উপস্থিতিই মিলছে এসব ‘ভিআইপি’ সবজিতে।
কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘অর্গানিক খামার’ থাকার দাবি করলেও সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। খামারের এক কোণে লোকদেখানো কিছু জৈব সার থাকলেও মূলত আড়ত থেকে আনা পণ্যই সেখানে প্যাকেটজাত হয়।
প্রকৃতপক্ষে কোনো সবজিকে অর্গানিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে আন্তর্জাতিক বা জাতীয়ভাবে স্বীকৃত কোনো সংস্থার সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়, যা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় কারোরই নেই।
এই প্রতারণা নিয়ে ভোক্তাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। রাজধানীর একটি সুপারশপের সামনে কথা হয় গৃহিণী শায়লা শারমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বাচ্চার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে প্রায়ই এখান থেকে বেশি দামে অর্গানিক সবজি কিনি। কিন্তু গত সপ্তাহে কেনা বেগুন কাটার পর ভেতরে যে পোকা দেখা গেল এবং যে চেহারা, তাতে মনে হলো না সাধারণ বাজারের চেয়ে আলাদা কিছু। আমাদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এরা পকেট কাটছে।”
অন্য এক ক্রেতা বেসরকারি চাকরিজীবী তানভীর আহমেদ অভিযোগ করেন, “অর্গানিক বললে তো মান নিশ্চিত থাকতে হবে। কিন্তু কোনো ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট বা সার্টিফিকেট তারা দেখাতে পারে না। শুধু মুখের কথায় বিশ্বাস করে আমরা প্রতারিত হচ্ছি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ তদারকি ও সার্টিফিকেশন অথরিটি না থাকার সুযোগে এই ‘অর্গানিক মাফিয়াতন্ত্র’ গড়ে উঠেছে। ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে এবং কেবল সুন্দর মোড়ক দেখে নয়, বরং উৎসের সঠিকতা যাচাই করেই বাড়তি টাকা খরচ করা উচিত। অন্যথায় স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন কমবে না, তেমনি আপনার কষ্টের উপার্জিত অর্থ চলে