Home চা শিল্প হাতের আঙুল বনাম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র: চা শিল্পে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগবে কবে?

হাতের আঙুল বনাম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র: চা শিল্পে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগবে কবে?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল: বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ চা শিল্প বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়ানোর চাপ রয়েছে, অন্যদিকে দেশের সিংহভাগ চা বাগান এখনও ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন পদ্ধতি ও অবকাঠামোয় আটকে আছে। চা বাগানগুলোর এই স্থবিরতা এবং আধুনিকায়নের ধীরগতিই এখন সামগ্রিক উৎপাদনের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেকেলে বাগান ও উৎপাদনহীন পুরনো গাছ
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ( বিটিআরআই ) এর বিজ্ঞানিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের ১৬৮টি চা বাগানের অধিকাংশেরই গোড়াপত্তন হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। অনেক বাগানে এখনও ৫০ থেকে ১০০ বছরের পুরনো চারাগাছ রয়েছে। চা গাছের একটি নির্দিষ্ট বয়স থাকে যখন তার উৎপাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। কিন্তু অর্ধশতক বা তার বেশি বয়সী এসব গাছ এখন আর আগের মতো ফলন দিতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পুরনো বাগান থেকে হেক্টরপ্রতি যে ফলন পাওয়া যাচ্ছে, তা বর্তমান সময়ের আধুনিক ক্লোন চারাগাছের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
রি-প্ল্যান্টিংয়ে অনীহা ও ধীরগতি
পুরনো গাছ তুলে নতুন চারা রোপণ বা ‘রি-প্ল্যান্টিং’ একটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। নতুন চারা থেকে পূর্ণ উৎপাদন পেতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগে। বাগান মালিকদের অভিযোগ, এই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোনো আয় ছাড়া বিপুল বিনিয়োগ বজায় রাখা ক্ষুদ্র ও মাঝারি বাগানগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে বার্ষিক যে হারে রি-প্ল্যান্টিং করার কথা ছিল, তা বাস্তবে খুবই নগণ্য। ফলে জাতীয় গড় উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।
কায়িক শ্রম বনাম আধুনিক যন্ত্রপাতি
বিশ্বের শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশগুলো যখন স্বয়ংক্রিয় প্লাকিং মেশিন ও আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তখন বাংলাদেশের বাগানগুলোতে এখনও হাতে কুঁড়ি তোলার সনাতন পদ্ধতিই প্রধান ভরসা। যদিও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের হাতের স্পর্শ চায়ের গুণমান বজায় রাখে, তবে বিশাল আয়তনের বাগানে দ্রুত পাতা সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বেশ ধীর। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে শ্রমিকের অভাবে অনেক সময় গুণগত মানসম্পন্ন কুঁড়ি নষ্ট হয়ে যায়।
কারখানার ভেতরেও অনেক ক্ষেত্রে মান্ধাতা আমলের মেশিন দিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
শ্রম বৈষম্য ও ব্রিটিশ প্রথা
অনুসন্ধানে জানা যায়, পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি চা বাগানগুলোতে আজও ব্রিটিশ আমলের ‘লেবার লাইন’ ও জীবনযাত্রার প্রথা প্রচলিত। স্বল্প মজুরি এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধার অভাবে নতুন প্রজন্মের শ্রমিকরা চা শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে কেবল গাছের পরিবর্তন নয়, বরং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির সাথে তাদের সংযোগ ঘটানো এখন সময়ের দাবি।
চা গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় বাগানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে রি-প্ল্যান্টিংয়ের আওতায় আনতে হবে। এজন্য বাগান মালিকদের সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী কৃষি ঋণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। কেবল প্রযুক্তির সংমিশ্রণ এবং প্রাচীন মানসিকতা পরিহার করলেই চা শিল্পে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া সম্ভব হবে।
আরও নানা বিষয় জানত ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com