মন্তব্য প্রতিবেদন
বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার একবার বলেছিলেন, “আমি তোমার মতের সাথে একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি জীবন দিতে পারি।” তবে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকার রক্ষার সেই মহান ব্রত যেন রূপ নিয়েছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত জেদে। দেশের প্রাচীনতম এবং প্রভাবশালী এই বাণিজ্যিক সংগঠনের বর্তমান দশা দেখে আজ মনে পড়ে যায় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সেই বিখ্যাত গল্পের কথা— যেখানে বিবাদমান দুই পক্ষই বিচার মানে, কিন্তু দিনশেষে দাবি করে ‘তালগাছটি আমার’।
দীর্ঘ ২০ মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো নির্বাচিত কমিটি নেই। যে কক্ষগুলো একসময় দেশের অর্থনীতির নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় মুখর থাকতো, সেখানে এখন কেবল আইনি ফাইলের স্তূপ আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ।
আইনি লড়াই নাকি কৌশলের দাবার ঘুঁটি?
চিটাগাং চেম্বারের এই অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন ঘিরে অন্তহীন মামলা। গত আট মাস ধরে এই আইনি জটিলতা এক গোলকধাঁধায় রূপ নিয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে পাঁচ-পাঁচবার স্থগিত হয়েছে নির্বাচন। এই অস্থিরতার নেপথ্যে বারবার উঠে আসছে ব্যবসায়ী মুহাম্মদ বেলাল হোসেনের নাম। যদিও তিনি নিজেকে ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙার সৈনিক হিসেবে দাবি করছেন, তবে এফবিসিসিআই-এর সালিশী ট্রাইব্যুনাল তার কর্মকাণ্ডকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে।
দুপক্ষের ‘তালগাছ’ নীতি ও সাধারণের ক্ষতি
চেম্বারের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায় ভিন্ন সুর। একদিকে ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’, অন্যদিকে ‘সমমনা পরিষদ’। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের তীরের অভাব নেই। এক পক্ষ বলছে, ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা নেই; অন্য পক্ষ বলছে, নির্বাচন বিলম্বিত করে বিশেষ কাউকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
এখানে সত্য হয়তো কোনো এক পক্ষের হাতে নয়, বরং দুপক্ষের মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। দুই পক্ষই মুখে বলছেন তারা বাণিজ্য সংগঠনের ঐতিহ্য রক্ষা করতে চান, কিন্তু বাস্তবে আইনি লড়াইয়ের নামে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার প্রচেষ্টায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ আজ বন্দি। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়— “মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক”— এই আকাঙ্ক্ষা যেন উভয় প্যানেলের নেতাদের মধ্যে প্রবল, কিন্তু সাধারণ ব্যবসায়ীরা আদতে কার লোক তা খুঁজে পাওয়াই এখন দায়।
অনিশ্চয়তার মেঘ এবং ব্যবসায়ীদের অপেক্ষা
সর্বশেষ শিডিউল অনুযায়ী ৪ এপ্রিল নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, ২২ এপ্রিল এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনাল সেই তফসিল বাতিল করে সরাসরি নির্বাচনের নির্দেশনা দিয়েছে। এখন বল উচ্চ আদালতের কোর্টে।
শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি কি তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে, নাকি আইনি মারপ্যাঁচে ‘তালগাছ’ দখলের এই লড়াই চলতেই থাকবে? ব্যবসায়ীরা আজ ক্লান্ত। তারা চাচ্ছেন এমন এক নেতৃত্ব, যারা মামলার স্তূপ সরিয়ে টেবিল জুড়ে বসবেন অর্থনীতির সমৃদ্ধির কথা বলতে।
চিটাগাং চেম্বার আইনি বেড়াজালে আটকা পড়ে, শতবর্ষী এই প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই আজ বড় ‘অসহায়’ হয়ে পড়েছে।
–কামরুল ইসলাম। সাংবাদিক। E-mail : btbd24@gmail.com










