Home অপরাজিতা এক আকাশ দূরত্বের মাঝে এক চিলতে স্মৃতি: মুমু ও জুঁইয়ের গল্প

এক আকাশ দূরত্বের মাঝে এক চিলতে স্মৃতি: মুমু ও জুঁইয়ের গল্প

ফিচার

মাহবুব হাসান, চট্টগ্রাম: কক্সবাজারের তপ্ত বালুচরে একটি নীল ছাতা। তার নিচে দুই বোন—মুমু আর জুঁই। দু’ বছর আগের সেই দিনটিতে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে তারা যা যা গল্প করেছিল, আজ তা কেবলই দীর্ঘশ্বাসের কাব্য। সেই ছাতাটি আজও হয়তো আছে, কিন্তু সেই নিবিড় সান্নিধ্য আজ যোজন যোজন দূরে।

একসাথে বড় হওয়া, ভিন্ন পথে যাত্রা

বেশিদিন আগের কথা নয়, মাত্র দেড় বছর আগেও মুমু আর জুঁই ছিল এক প্রাণ, এক আত্মা। একই ছাদের নিচে বড় হওয়া, একই ঘরে খুনসুটি আর মধ্যরাত অবধি চলত তাদের অফুরন্ত গল্প। কিন্তু জীবন বড় অদ্ভুত।

বড় হওয়ার সাথে সাথে ডানা গজায় স্বপ্নের, আর সেই স্বপ্নই একসময় আপনজনদের থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

ছোট বোন জুঁই পাড়ি জমিয়েছে সুদূর জার্মানিতে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাকে নিয়ে গেছে এমন এক দেশে, যেখানে ঋতু বদলায় কিন্তু চেনা মানুষের মুখগুলো দেখা যায় না। অন্যদিকে, বড় বোন মুমুর বিয়ে হয়ে গেছে। সে এখন ব্যস্ত তার নতুন সংসার আর শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব নিয়ে।

মুমুর জীবনের অন্যতম বড় উৎসব ছিল তার বিয়ে। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে জুঁই সেখানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেনি। যে বোনটির সাথে শৈশব থেকে বিয়ের পরিকল্পনা চলত, সেই বোনটিই আপুর বিয়ে দেখল হাজার মাইল দূর থেকে, মোবাইলের এক টুকরো কাঁচের স্ক্রিনে—ভিডিও কলের মাধ্যমে। সেই আনন্দাশ্রু আর দূরত্বের হাহাকার হয়তো কেবল তারাই বোঝে।

এই ছবিটি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে তোলা। চড়া রোদে দুই বোন মিলে একটি নীল নকশা করা ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল। মুমুর স্নিগ্ধ চাউনি আর জুঁইয়ের চশমার আড়ালে সেই মৃদু হাসি—আজ যেন ফ্রেমে বাঁধানো এক দীর্ঘশ্বাস।

তখন তারা জানত না, খুব শীঘ্রই তাদের মাঝখানে চলে আসবে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ব্যবধান।

জার্মানির কনকনে শীতের রাতে জুঁই হয়তো গ্যালারি ঘেঁটে এই ছবিটি দেখে স্মৃতিকাতর হয়। আর মুমু তার ব্যস্ত সংসারের ফাঁকে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ভাবে সেই দিনগুলোর কথা, যখন কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই তারা এভাবে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াত। “রক্তের টান হয়তো দূরত্বের কাছে হার মানে না, কিন্তু সময় আর বাস্তবতার কাছে আমাদের মাঝেমধ্যে বড় অসহায় হয়ে পড়তে হয়।”

মুমু আর জুঁই এখন যার যার জীবনে থিতু। একজন ঘর সামলাচ্ছে, অন্যজন ক্যারিয়ার গড়ছে। মাঝখানে পড়ে আছে কেবল এই স্থিরচিত্রগুলো। কক্সবাজারের সেই নীল ছাতাটি আজ প্রতীকের মতো দাঁড়িয়ে আছে—যা মনে করিয়ে দেয়, জীবন এগিয়ে গেলেও কিছু স্মৃতি চিরকাল অমলিন থেকে যায় হৃদয়ের মণিকোঠায়।