এক সময় মানব সভ্যতার ইতিহাসে নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে বা ‘কাজিন ম্যারেজ’ ছিল অত্যন্ত স্বীকৃত এবং জনপ্রিয় একটি প্রথা। রাজনৈতিক মিত্রতা মজবুত করা, পারিবারিক সম্পদ ও উত্তরাধিকার নিজেদের বৃত্তে আটকে রাখা কিংবা সামাজিক সামঞ্জস্য রক্ষার ক্ষেত্রে এই ধরনের বিয়ের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। ইউরোপের রাজপরিবার থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল—সবখানেই এই প্রথাকে স্থিতিশীল ও কৌশলগত হিসেবে দেখা হতো।
তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বের উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে জন্মগত স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আসায় অনেক সমাজেই এখন এটি নিরুৎসাহিত করা হয়। তবুও ঐতিহ্য, ধর্ম কিংবা স্থানীয় রীতির কারণে বিশ্বের বেশ কিছু দেশে আজও এই প্রথা প্রবলভাবে টিকে আছে।
যেসব দেশে এই প্রবণতা বেশি:
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে এই বিয়ের হার ভিন্ন ভিন্ন হয়। মূলত মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে এই সংস্কৃতি এখনো বেশ শক্তিশালী।
১. পাকিস্তান: দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানে কাজিন ম্যারেজের হার সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির মোট বিয়ের প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশই নিকটাত্মীয়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এটি মূলত পারিবারিক সংহতি এবং বংশীয় আভিজাত্য রক্ষার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
২. সৌদি আরব: মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতেও বংশপরম্পরায় আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের প্রচলন রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির সরকার বিয়ের আগে বাধ্যতামূলক জিনতাত্ত্বিক পরীক্ষার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করছে যাতে সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানো যায়।
৩. কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত: এই দেশগুলোতেও সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বজায় রাখার তাগিদে কাজিন ম্যারেজের হার উল্লেখযোগ্য। পারিবারিক সম্পদ যাতে বাইরে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা এখানে একটি বড় উদ্দেশ্য।
৪. মিশর ও সুদান: উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতেও উপজাতীয় এবং গ্রামীণ কাঠামোর কারণে নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের সংস্কৃতি বজায় আছে।
বিজ্ঞান কী বলছে?
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, স্বামী ও স্ত্রী যদি নিকটাত্মীয় হন, তবে তাদের সন্তানদের মধ্যে ‘রিসেসিভ জেনেটিক ডিসঅর্ডার’ বা বংশগত রোগ হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ দম্পতির তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ সন্তান জন্ম নেয়, তবুও থ্যালাসেমিয়া বা অন্যান্য জন্মগত ত্রুটির আশঙ্কায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়ছে।
পরিশেষে বলা যায়, অনেক আধুনিক সমাজ এই প্রথা নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত করলেও বিশ্বের একটি বড় অংশে এটি এখনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গভীর মূল গেঁথে আছে।