স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা অত্যাধুনিক গেজেট—উন্নত বিশ্বের মানুষের কাছে যা প্রযুক্তির আশীর্বাদ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তা এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে লাখ লাখ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) অবৈধভাবে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে পাচার হচ্ছে। এই ‘ডিজিটাল ডাম্পিং’-এর আড়ালে কাজ করছে এক বিশাল আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র।
আইনি ফাঁকফোকর: ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ বনাম ‘বর্জ্য’
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিষাক্ত ই-বর্জ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ হলেও পাচারকারীরা ব্যবহার করছে চতুর কৌশল। শিপিং কন্টেইনারে করে আসা এই বর্জ্যগুলোকে কাগজে-কলমে ‘সেকেন্ড হ্যান্ড গুডস’ (ব্যবহৃত পণ্য) অথবা ‘প্লাস্টিক স্ক্র্যাপ’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, এসব কন্টেইনারের সামনের দিকে কিছু সচল পুরনো পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়, কিন্তু ভেতরে থাকে শত শত টন অকেজো সার্কিট বোর্ড, সিসা-যুক্ত ব্যাটারি এবং ক্যাথোড রে টিউব। উন্নত দেশে এই বর্জ্য রিসাইকেল করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায়, তারা নামমাত্র মূল্যে এগুলো গরিব দেশগুলোতে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক জব্দ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি
২০২৪ এবং ২০২৫ সালে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বন্দরগুলোতে এই পাচারের ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে। মালয়েশিয়া সরকার সম্প্রতি কয়েকশ কন্টেইনার জব্দ করে দেখেছে যে, সেগুলোতে অত্যন্ত বিপজ্জনক ই-বর্জ্য ছিল যা প্লাস্টিক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছিল।
এই ঘটনার পর মালয়েশিয়া ই-বর্জ্য আমদানিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। ইন্টারপোলের দেওয়া তথ্যমতে, এই পাচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক লজিস্টিক মাফিয়ারা জড়িত, যারা ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার করে বন্দর কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিচ্ছে।
মৃত্যুর ভাগাড়: আগবোগব্লোশি ও নাইজেরিয়ার শিশুদের কান্না
এই ডিজিটাল ডাম্পিংয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে আফ্রিকা মহাদেশে। ঘানার আগবোগব্লোশি (Agbogbloshie) বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ই-বর্জ্যের ডাম্পিং সাইট হিসেবে পরিচিত।
শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: এখানে হাজার হাজার শিশু মাত্র কয়েক ডলারের বিনিময়ে সারাদিন খালি হাতে পুরনো তার পোড়ায় এবং সার্কিট বোর্ড ভাঙচুর করে।
বিষক্রিয়া: তার পোড়ানোর ফলে নির্গত হওয়া ধোঁয়ায় থাকে ডাইঅক্সিন এবং ফুরান, যা সরাসরি ফুসফুস ও মস্তিস্কের ক্ষতি করে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান: এখানকার শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা সাধারণের চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি পাওয়া গেছে। নাইজেরিয়ার ল্যান্ডফিলগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে ই-বর্জ্যের বিষে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি চিরতরে বিষাক্ত হয়ে পড়ছে।
দায় কার?
উন্নত বিশ্ব যখন নিজেদের পরিবেশকে ‘সবুজ’ ও ‘পরিচ্ছন্ন’ রাখার বড় বড় বুলি দিচ্ছে, তখন তাদের ফেলে দেওয়া বিষাক্ত বর্জ্য অন্য প্রান্তের শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদীরা বলছেন, যতক্ষণ না উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের বর্জ্যের দায়ভার (EPR) পুরোপুরি গ্রহণ করছে, ততক্ষণ এই ‘ডিজিটাল ডাম্পিং’ থামানো সম্ভব নয়।
আমাদের পরবর্তী আপডেট পেতে এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ বিষয়ক তথ্যের জন্য businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানান। আপনার মতামত আমাদের আরও সচেতন করতে সাহায্য করবে।