Home অন্যান্য চেট্টিয়াদ: তামিলনাড়ুর নিভৃত গ্রামে ১০,০০০ রাজকীয় প্রাসাদের বিস্ময়গাথা

চেট্টিয়াদ: তামিলনাড়ুর নিভৃত গ্রামে ১০,০০০ রাজকীয় প্রাসাদের বিস্ময়গাথা

লোটাস প্যালেস

আমিরুল মোমেনিন

তামিলনাড়ুর গ্রামীণ হাইওয়ে ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। চারদিকে ধুলোবালি ও আগাছা ঘেরা সরু গলি, অবাধে চরে বেড়ানো গরু, আর মন্দিরের পুকুরে পুণ্যার্থীদের অবগাহন—প্রথম দর্শনে কানাদুকাতান গ্রামটিকে দক্ষিণ ভারতের আর দশটা সাধারণ গ্রামের মতোই মনে হবে। কিন্তু মোড় ঘুরলেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে এক চরম বিস্ময়। সেখানে জীর্ণ কুটিরের বদলে মাইলের পর মাইল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকার ঐতিহাসিক সব প্রাসাদ।
এক অনন্য স্থাপত্যের মেলবন্ধন
তামিলনাড়ুর চেট্টিয়াদ অঞ্চলে কানাদুকাতানের মতো ৭৩টি গ্রাম ও দুটি শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রায় ১০,০০০ এমন অট্টালিকা। এখানকার প্রতিটি বাড়ি একে অপরের থেকে আলাদা। ইতালীয় স্টাইলের বারান্দা, দুর্গের মতো গম্বুজ, ধ্রুপদী মার্বেল স্তম্ভ, বার্মিজ সেগুন কাঠের দরজা আর হিন্দু দেবদেবীর মূর্তির এক অদ্ভুত কিন্তু নান্দনিক মিশেল এই বাড়িগুলো।
এই বিলাসবহুল প্রাসাদগুলো মূলত চেট্টিয়ার সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধির প্রতীক। ১৩শ শতাব্দী থেকে রত্ন, মশলা ও লবণের ব্যবসায়ী এই সম্প্রদায়টি ১৯শ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অত্যন্ত প্রভাবশালী অংশীদার হয়ে ওঠে। বার্মা, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে ব্যবসা করে অর্জিত বিপুল সম্পদ তারা ব্যয় করেছিলেন নিজেদের ভিটেমাটিতে এই প্রাসাদগুলো নির্মাণে।
ধ্বংসাবশেষ থেকে বিলাসিতার পথে: হেরিটেজ ট্যুরিজম
কয়েক দশক ধরে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকা এই প্রাসাদগুলো এখন পর্যটকদের হাত ধরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। অনেকগুলো প্রাসাদকে রূপান্তরিত করা হয়েছে বিলাসবহুল ‘হেরিটেজ হোটেলে’।
দ্য বাংগালা (The Bangala): ১৯৯৯ সালে মীনাক্ষী মাইয়াপ্পান তার স্বামীর পৈত্রিক বাড়িকে পর্যটকদের থাকার উপযোগী করে তোলেন। এটি এই অঞ্চলের প্রথম হেরিটেজ হোটেল, যা আজও একটি রুচিশীল পারিবারিক আবহের স্বাদ দেয়।
দ্য লোটাস প্যালেস (THE Lotus Palace): সম্প্রতি দ্য পার্ক হোটেলস গ্রুপের অধীনে এই প্রাসাদটি নবরূপে সেজে উঠেছে। উজ্জ্বল লাল, নীল আর গেরুয়া রঙের কারুকাজ খচিত এই প্রাসাদে এখন আধুনিক পর্যটনের ছোঁয়া।
প্রাসাদের অন্দরমহল ও জীবনধারা
এই প্রাসাদগুলোর নকশা করা হয়েছিল মূলত পারিবারিক উৎসব ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কথা মাথায় রেখে। সাধারণত একটি প্রাসাদে তিনটি বিশাল উঠোন থাকে:
প্রথম উঠোন: সামাজিক ও ধর্মীয় কাজের জন্য, যা এখন হোটেলের রিসেপশন বা লাউঞ্জ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
দ্বিতীয় উঠোন: খাবার জায়গা এবং মহিলাদের বিশ্রামের জন্য।
তৃতীয় উঠোন: রান্নাঘরের এলাকা, যা অনেক হোটেলে এখন সুইমিং পুলে রূপান্তরিত।
লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের হাতছানি
কারাইকুডি শহরের অ্যান্টিক শপ বা পুরোনো জিনিসের দোকানে গেলে এই ঐতিহ্যের ক্ষয়িষ্ণু রূপটি চোখে পড়ে। সেখানে বিশালাকার সেগুন কাঠের দরজা থেকে শুরু করে হাতে আঁকা সিন্দুক—সবই নিলামের অপেক্ষায়। বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারত বিভাগের পর চেট্টিয়ারদের ব্যবসায়িক পতন শুরু হয়, যার ফলে অনেক পরিবারই এই বিশাল প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
‘রাজা বিরুন্ধু’: রাজকীয় ভোজের স্বাদ
চেট্টিয়াদ ভ্রমণে স্থাপত্যের পাশাপাশি আরেকটি প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার খাবার। পর্যটকদের জন্য এখানে ‘রাজা বিরুন্ধু’ বা ‘রাজার উপযুক্ত ভোজ’-এর ব্যবস্থা থাকে। কলাপাতায় ২১ রকমের সুস্বাদু পদ—যার মধ্যে ম্যাঙ্গো রাইস থেকে শুরু করে বিশেষ মাটন কারি এবং ফুলকপি ফ্রাই অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া বিকেলের নাস্তায় থাকে ঐতিহ্যবাহী মসলাদার ভাজাজি ও ডাল-গুড়ের মিষ্টি।
তাঁত ও হস্তশিল্পের ঐতিহ্য
খাবার ও প্রাসাদের বাইরেও এখানে বেঁচে আছে শত বছরের পুরনো হস্তশিল্প। আথাঙ্গুদি টাইলস কারখানায় এখনো শ্রমিকরা বালি ও সিমেন্ট দিয়ে হাতে নকশা করা চমৎকার টাইলস তৈরি করেন। পাশাপাশি চেট্টিয়াদ সুতির শাড়ির কদর এখনো তুঙ্গে, যা পর্যটকদের কেনাকাটার তালিকায় শীর্ষে থাকে।
প্রাসাদগুলোর রঙ হয়তো রোদে কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে, কিন্তু পর্যটন শিল্পের হাত ধরে চেট্টিয়াদ আবার তার হৃত গৌরব ফিরে পেতে শুরু করেছে। ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা এই অঞ্চলটি এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক নতুন গন্তব্য।

এরকম আরও তথ্য ও ফিচারের জন্য ভিজিট করুন www.businesstoday24.com